![]() |
| Colonia movie scene |
ফ্লোরিয়ান গ্যালেনবার্গার পরিচালিত ২০১৫ সালের ছবি "কলোনিয়া" একটি ঐতিহাসিক ড্রামা থ্রিলার, যা চিলির সামরিক অভ্যুত্থান এবং কুখ্যাত "কলোনিয়া ডিগনিদাদ" (Colonia Dignidad) নামক এক জার্মান সম্প্রদায়ের সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। এই ছবিটি রোমান্স, সাসপেন্স এবং ভয়াবহ নির্যাতনের এক মিশ্রণ।
ছবির মূল প্রেক্ষাপট (True Story Background):
"কলোনিয়া ডিগনিদাদ" (পরবর্তীতে 'ভিলা বাভিয়েরো' Vila Baviera নামে পরিচিত) ছিল চিলির একটি বিচ্ছিন্ন জার্মান সম্প্রদায়, যা পল শ্যাফার (Paul Schäfer) নামের একজন প্রাক্তন নাৎসি স্বাস্থ্যকর্মী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে শুরু হলেও, এটি আসলে একটি ভয়ঙ্কর নির্যাতন কেন্দ্র এবং ধর্মান্ধতার আড়ালে থাকা একটি গোপনীয় সমাজ ছিল। অগাস্টো পিনোচেটের সামরিক শাসনের সময় (১৯৭৩-১৯৯০), এই কলোনিয়া পিনোচেটের গুপ্ত পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করত এবং রাজনৈতিক বন্দীদের এখানে নিয়ে এসে নির্যাতন করা হতো। এই কলোনিয়ার ভেতরের জীবন ছিল ভয়াবহ; সদস্যরা বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল, তাদের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল, এবং যৌন নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, এবং জোরপূর্বক শ্রমের মতো ঘটনা ঘটত।
ছবির প্লট:
১৯৭৩ সালে চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের সময় ছবিটি শুরু হয়। গল্পের মূল চরিত্র হলো লেনা (Lena), একজন জার্মান বিমান সেবিকা, এবং তার প্রেমিক ড্যানিয়েল (Daniel), একজন জার্মান আলোকচিত্রী। ড্যানিয়েল চিলিতে রাজনৈতিক অস্থিরতার ছবি তুলছিল এবং সালভাদর আলেন্দে সরকারের একজন সমর্থক ছিল।
১. গ্রেফতার ও ড্যানিয়েলের অপহরণ: চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে এবং পিনোচেটের বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। আলেন্দে-পন্থী হিসেবে ড্যানিয়েলকে গ্রেফতার করা হয়। লেনাও গ্রেফতার হয়, কিন্তু তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে সে জানতে পারে যে ড্যানিয়েলকে কুখ্যাত "কলোনিয়া ডিগনিদাদ"-এ নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
২. লেনার কলোনিয়ায় প্রবেশ: লেনা জানতে পারে যে এই কলোনিয়া থেকে কেউ কখনো জীবিত ফিরে আসেনি। এটি বাইরে থেকে একটি শান্তিপূর্ণ কৃষি সম্প্রদায় মনে হলেও, এর ভেতরে ছিল এক অন্ধকার জগত। ড্যানিয়েলকে বাঁচাতে লেনা স্বেচ্ছায় এই কলোনিয়ায় যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে সে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।
৩. কলোনিয়ার ভেতরে জীবন: কলোনিয়ায় প্রবেশের পর লেনা জানতে পারে সেখানকার ভয়াবহ জীবনযাত্রার কথা। পুরুষ এবং মহিলাদের কঠোরভাবে আলাদা রাখা হয়, তাদের উপর অমানবিক আচরণ করা হয়, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। পল শ্যাফার নিজেকে একজন ত্রাণকর্তা এবং ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে দাবি করে, কিন্তু সে আসলে একজন বিকৃতমনা স্বৈরাচারী। কলোনিয়ার ভেতরে পিনোচেটের সামরিক বাহিনীর সাথে শ্যাফারের যোগাযোগ ছিল, এবং রাজনৈতিক বন্দীদের ওপর এখানেই নির্যাতন চালানো হতো। লেনা খুঁজে পায় ড্যানিয়েলকে, কিন্তু তাকে নির্যাতনের ফলে চিনতে পারা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। ড্যানিয়েলকে এক ধরনের মানসিক রোগী হিসেবে অভিনয় করতে হয় যাতে সে শ্যাফারের চোখে কম বিপজ্জনক মনে হয়।
৪. পালানোর চেষ্টা: লেনা এবং ড্যানিয়েল দুজনেই কলোনিয়া থেকে পালানোর পরিকল্পনা করে। তাদের সাথে কলোনিয়ার আরও কিছু সদস্য যুক্ত হয়, যারা এই ভয়াবহ জীবন থেকে মুক্তি পেতে চায়। পালানোর চেষ্টা বেশ কয়েকবার ব্যর্থ হয় এবং তাদের উপর আরও নির্যাতন নেমে আসে।
৫. তথ্য ফাঁস: লেনা এবং ড্যানিয়েল কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি খুঁজে পায়, যা কলোনিয়ার ভেতরের নির্যাতন এবং পিনোচেটের সরকারের সাথে তাদের যোগাযোগের প্রমাণ দেয়। তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে এই নথিগুলো বাইরে নিয়ে গিয়ে দুনিয়ার কাছে কলোনিয়ার আসল চেহারা তুলে ধরতে হবে।
৬. শেষ মুহূর্তের পালানো: অনেক বাধা পেরিয়ে, লেনা, ড্যানিয়েল এবং তাদের সাথে থাকা অন্য একজন কলোনিয়ার সদস্য (যিনি তাদের পালানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন) শেষ পর্যন্ত কলোনিয়া থেকে পালাতে সক্ষম হয়। তাদের পেছনে কলোনিয়ার রক্ষীরা লেগে থাকে। তারা জার্মান দূতাবাস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। জার্মান দূতাবাস তাদের সাহায্য করে এবং চিলি থেকে নিরাপদে জার্মানিতে ফিরে যেতে সাহায্য করে।
ছবির মূল বার্তা:
"কলোনিয়া" ছবিটি শুধু একটি রোমান্টিক থ্রিলার নয়, এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, ধর্মের নামে নির্যাতন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়কে তুলে ধরে। এটি দেখায় কিভাবে একটি স্বৈরাচারী শাসন (পিনোচেটের সামরিক জান্তা) এবং একটি ভণ্ড ধর্মীয় গোষ্ঠী (কলোনিয়া ডিগনিদাদ) একে অপরের সাথে হাত মিলিয়েছিল মানুষের উপর অমানবিক অত্যাচার চালানোর জন্য। ছবিটি মানব স্বাধীনতার গুরুত্ব এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার অদম্য ইচ্ছাকে তুলে ধরে। এটি দর্শকদের মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া কতটা জরুরি, যাতে এমন ভয়াবহ ঘটনা আর না ঘটে।

0 Comments