ফ্ল্যাটলাইনার্স (২০১৭) একটি আমেরিকান সাইন্স ফিকশন হরর চলচ্চিত্র। এটি ১৯৯০ সালের একই নামের চলচ্চিত্রের একটি সিক্যুয়েল এবং একই সাথে রিবুটও বলা যেতে পারে। ছবির মূল প্লট একই রকম হলেও, নতুন কিছু চরিত্র এবং একটি নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করা হয়েছে।
![]() |
| Flatliners movie scene |
গল্পের সারাংশ:
গল্পটি শুরু হয় মেডিকেল কলেজের পাঁচজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী শিক্ষার্থীর সাথে: কোর্টনি (এলেন পেজ), মারলো (নিনা ডোব্রেভ), জেমি (জেমস নর্টন), সোফিয়া (কিয়ার্সি ক্লেমনস) এবং রে (ডিয়েগো লুনা)। এদের মধ্যে কোর্টনি মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে খুব আগ্রহী। সে বিশ্বাস করে যে মৃত্যুর অভিজ্ঞতা লাভ করে ফিরে এলে ব্রেন অ্যাকটিভিটি এবং মানুষের চেতনা সম্পর্কে নতুন কিছু জানা যেতে পারে।
কোর্টনি তার বন্ধুদের সাথে একটি পরীক্ষা করার প্রস্তাব দেয়: তারা নিজেদের হৃদপিণ্ড বন্ধ করে ক্লিনিক্যালি মৃত হবে এবং কয়েক মিনিটের জন্য "ফ্ল্যাটলাইন" করবে (অর্থাৎ, তাদের ব্রেন অ্যাকটিভিটি ফ্ল্যাট হয়ে যাবে, যা মৃত্যুর লক্ষণ), তারপর তাদের পুনরুজ্জীবিত করা হবে। প্রথমে সোফিয়া দ্বিধা করলেও, জেমি এই ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষায় অংশ নিতে রাজি হয়।
প্রথমেই কোর্টনি এই অভিজ্ঞতা নেয়। সে এক মিনিটের জন্য মারা যায় এবং তারপর তাকে সফলভাবে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। মৃত্যুর পর সে কিছু অদ্ভূত এবং সুন্দর স্মৃতি নিয়ে ফিরে আসে, এবং তার ব্রেন অ্যাকটিভিটি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। সে হঠাৎ করেই অনেক কিছু মনে করতে পারে এবং আরও বেশি বুদ্ধিমান ও অনুপ্রাণিত মনে হয়।
কোর্টনির সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে, মারলো, জেমি এবং সোফিয়াও ফ্ল্যাটলাইন করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রত্যেকেই মৃত্যুর অভিজ্ঞতা থেকে কিছু বিশেষ ক্ষমতা এবং স্মৃতি নিয়ে ফিরে আসে। তারা আরও স্মার্ট, আত্মবিশ্বাসী এবং তাদের জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। তারা তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে ভালো গ্রেড অর্জন করে এবং তাদের ব্যক্তিগত জীবনও উন্নত হতে থাকে।
কিন্তু তাদের এই "মৃত্যু-পরবর্তী" অভিজ্ঞতার একটি অন্ধকার দিকও সামনে আসতে শুরু করে। প্রত্যেকেই তাদের অতীত জীবনের ভুলের জন্য ভৌতিক দর্শন (hallucinations) এবং ভীতিকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে থাকে। এই দর্শনগুলো তাদের বিবেককে দংশন করে এবং তাদের করা অতীতের ভুলগুলো ফিরে আসে, যেমন - কোর্টনি তার ছোট বোনের দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার জন্য নিজেকে দায়ী করে, মারলো তার সহকর্মীর একটি ভুল চিকিৎসার জন্য নিজেকে অপরাধী মনে করে, এবং জেমি তার প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে প্রতারণার জন্য অনুতপ্ত হয়।
এই ভীতিকর অভিজ্ঞতাগুলো ক্রমশ আরও বাস্তব এবং বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তারা বুঝতে পারে যে মৃত্যুর অভিজ্ঞতা তাদের উপর একটি অভিশাপ বয়ে এনেছে। তাদের অতীতের ভুলগুলো এখন তাদের পিছু নিয়েছে এবং তাদের জীবনকে নরকে পরিণত করছে। তাদের ভৌতিক দর্শনগুলো তাদের উপর শারীরিক আক্রমণও করতে শুরু করে।
এক পর্যায়ে, তারা বুঝতে পারে যে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো তাদের করা ভুলগুলো শুধরে নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে ক্ষমা চাওয়া। তারা একে অপরের মুখোমুখি হয় এবং তাদের গোপনীয়তাগুলো প্রকাশ করে।
শেষের অংশ:
ফিল্মের শেষের দিকে, তারা একে একে তাদের অতীতের ভুক্তভোগীদের কাছে ক্ষমা চায় এবং তাদের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করে।
- কোর্টনি: তার ছোট বোনের মৃত্যুর জন্য নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না এবং শেষ পর্যন্ত তার উপর চাপানো ভূতীয় আক্রমণের শিকার হয়ে মারা যায়। সে একপ্রকার তার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করে।
- মারলো: তার মেডিকেল ভুলের জন্য ভুক্তভোগীর পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজেকে রক্ষা করে।
- জেমি: তার প্রাক্তন প্রেমিকার কাছে ক্ষমা চায় এবং তাকে শান্তিতে থাকতে দেয়।
- সোফিয়া: তার হাই স্কুল সহপাঠীর সাথে খারাপ ব্যবহার করার জন্য তার কাছে ক্ষমা চায়।
- রে: সে একমাত্র ব্যক্তি যে প্রথমদিকে ফ্ল্যাটলাইন করেনি। সে তার বন্ধুদের এই বিপজ্জনক খেলা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে এবং তাদের সাহায্য করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে।
সবাই তাদের ভুলগুলো শুধরে নিতে পারলেও, কোর্টনি তার অতীত থেকে মুক্তি পায় না এবং সে মারা যায়। এই ঘটনা অন্যদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। সিনেমার শেষে, মারলো, জেমি, সোফিয়া এবং রে তাদের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং তাদের জীবনের নতুন দিকে এগিয়ে যায়, অতীতের ছায়া থেকে মুক্তি পেয়ে।
মূল বিষয়বস্তু (Themes):
- মৃত্যুর ভয় ও পরকাল: সিনেমার প্রধান থিম হলো মানুষের মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে কৌতূহল এবং ভয়।
- পাপ ও প্রায়শ্চিত্ত: ফ্ল্যাটলাইন করার পর চরিত্রগুলো তাদের অতীতের ভুলগুলোর জন্য শাস্তি পেতে শুরু করে। এটি পাপ এবং প্রায়শ্চিত্তের ধারণাকে তুলে ধরে।
- জ্ঞান এবং ক্ষমতা বনাম নৈতিকতা: চরিত্রগুলো জ্ঞান এবং ক্ষমতা অর্জনের জন্য নৈতিক সীমা অতিক্রম করে, যার ফলস্বরূপ তাদের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে।
- অপরাধবোধ এবং ক্ষমা: নিজের অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেতে এবং অন্যদের ক্ষমা করার গুরুত্ব এখানে দেখানো হয়েছে।
- মানুষের সীমাবদ্ধতা: এই সিনেমাটি মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং প্রকৃতির নিয়ম ভাঙার ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরে।
ফ্ল্যাটলাইনার্স (২০১৭) মূলত একটি সাসপেন্সফুল সাইন্স ফিকশন হরর ফিল্ম যা দর্শককে মৃত্যুর পরের রহস্যময় জগত এবং মানুষের পাপের পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করতে বাধ্য করে।

0 Comments